,

অলিকুল শিরোমণি হযরত লাল মিয়া শাহ (রহ.)



: মুহাম্মদ মহিউদ্দিন ইমন :

মহান আল্লাহ তায়ালা বিশ্ব ভ্রমাণ্ডের ক্ষুদ্রতম গ্রহ এ পৃথিবীতে সৃষ্টির সেরা তথা আশরাফুর মাকলুকা স্বীকৃতি দিয়ে মানুষ সৃষ্টি করেছেন। এই মানবকুলকে সরল ও সত্য পথে পরিচলনা তথা হেদায়াতের জন্য যুগে যুগে প্রেরণ করেছেন অসংখ্য নবী রাসুল। তাঁরা আল্লার বিধান মতে আল্লার একত্ববাদ, ঈমান, তাকওয়া, তাহজিব এবং সর্বপরি ইসলামের বাণী প্রচার করে গেছেন। আল্লাহ তায়ালা সময়ে সময়ে অলি বুজুর্গ, সুফি সাধক, গাউছ কুতুব, পীর দরবেশ প্রেরণ করেছেন এবং করবেন।

খোদার হুকুমে মানুষকে কোরআন সুন্নাহ এবং ইসলামের সঠিক ধর্ম পথে আহবান করেছেন। পাশাপাশি তাঁরা বেলায়াতের জ্যোতিতে মানুষকে সার্বিক সাহায্য ও সহযোগীতা করে মানব সেবার মত মহৎ দায়িত্ব পালন করেছেন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মত বাংলাদেশেও সামাজিক মানবিক, ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের ধারায় অলি-আউলিয়া, পীর-ফকির, ও সুফিদের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃত অর্থে পীর আউলিয়ারাই বাংলাদেশে ইসলাম ধর্ম ও মুসলিম সভ্যতার প্রকৃত মশালবাহী। ইসলামী বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের মত আমাদের অত্র অঞ্চলেও আল্লাহ তায়ালার কুদরতের কথা প্রকাশ হিসেবে অসংখ্য অলি আল্লাহ বিকশিত হয়েছে।

তেমনি একজন কিংবদন্তিতুল্য অলিয়ে কামেলের নাম শাহ সুফি হযরত লাল মিয়া শাহ (রহ.)। তিনি চট্টগ্রাম জেলার রাউজান উপজেলার পশ্চিম গুজরা গ্রামে বাংলা ১২৮৫ সালের ১৮ ফাল্গুন উষা লগ্নে জন্মগ্রহন করেন। তাঁর পিতার নাম মরহুম সুফি আকবর আলী। শৈশব কাল থেকেই হযরত লাল মিয়া শাহ আনমনা ও গম্ভীর প্রকৃতির ছিলেন তিনি নিজের খেয়াল খুশি মত চলাফেরা করতেন। একমনে এক ধ্যানে কি এক আকর্ষনে বনে জঙ্গলে বসে থাকতেন। এভাবে ইলমে মারেফাতে এলাহির অধিকারী প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষক থেকে জ্ঞান অর্জনে মনযোগী ছিলেন না। প্রাকৃতিক বৈচিত্র অনুপম দৃশ্যের মাঝে ডুবে থেকে একাকি এলাহির পানে তিনি এমনই মগ্ন থাকতেন যে তাঁহার ক্ষুধা তৃষ্ণার অনুভব পর্যন্ত লোপ পেয়েছিল। তিনি আহার নিদ্রা এবং সুখের প্রতি বিন্দু মাত্র আকৃষ্ট ছিলেন না। কঠোর সাধনার মধ্য দিয়ে মহান সৃষ্টিকর্তার নৈকট্য লাভই ছিল তাঁর জীবনের লক্ষ্য।

তাঁর বাবা সংসার ত্যাগী আত্মভোলা একমাত্র ছেলেকে সংসার জীবনে ফিরিয়ে আনতে সম্পুর্ণ ব্যর্থ হয়ে মাইজভান্ডার দরবার শরীফের কাণ্ডারী হযরত মাওলানা ছৈয়দ আহম্মদ উল্লাহ (রহ.) আস্তানায় নিয়ে গিয়েছিলেন। হযরত কেবলার হুজরার সামনে বালতি ভর্তি পানিতে পা ডুবিয়ে দিলেন। বালতিতে পা ডুবিয়ে দিতে দেখে তাঁর বাবা তাঁকে খুব জোরে গালে একটা ছড় মারলেন। হযরত কেবলা খোদা প্রেমিক লাল মিয়া শাহ’র উদাসীনতার কারণ বুঝতে পারলেন। ছড় মারতে দেখে হযরত কেবলা প্রচণ্ডভাবে রেগে উঠে বললেন তুমি এই ছেলেকে ছড় মারলে কেন? তুমি তাঁকে চেন? তখন তাঁর পিতা ভয়ে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বললেন, হুজুর এই ছেলে আমার একমাত্র সম্বল। তার মাথা খারাপ তাকে দোয়া করুন। তখন হযরত কেবলা রাগস্বরে বললেন কে বলেছে এ তোমার ছেলে এতো তোমার বাবা। একে ধরে রাখা যাবে না ছেড়ে দাও, যেতে দাও। হযরত কেবলা এই মহান খোদা প্রেমিককে কাছে ডেকে চোখে মুখে আর পিঠে হাত বুলিয়ে বললেন ‘যাও বেটা তোমার পথে চলে যাও’।

সাধারণ মানুষ দর্শন করে চক্ষু দিয়ে আর অলি আল্লাহগণ দর্শন করেন অন্তদৃষ্টি দিয়ে। মাইজভাণ্ডার শরীফের আধ্যাত্যিক গুরু হযরত কেবলার তাঁর জবানের নির্দেশ শোনা মাত্র এই মহান সাধক এমন দৌড় দিলেন এবং চোখের পলকে কিভাবে অদৃশ্য হলেন তা উপস্থিত কেউ টের পাইনি। এভাবে চলে যাওয়ার পর দীর্ঘ ২০ বছর তিনি কোথায় কিভাবে ছিলেন তা সর্বদ্রষ্টা আল্লাহ তায়ালা জানেন। সুদীর্ঘ ২০ বছর নিখোঁজ নিরুদ্দেশে সাধনা জীবন অতিবাহিত করার পরে অবশেষে চট্টগ্রাম শহরে পার্বত্য অঞ্চলে হযরত লাল মিয়া শাহকে পাগল বেশে ঘোরাফেরা করতে দেখা গিয়েছিল। এসময় তাঁর সাথে কথা বলতে চাইলে তিঁনি বলতেন আমার অনেক কাজ, কথা বলার সময় নেই চলে যান। সুদীর্ঘ সাধনা জীবনের অন্তিম মুহুর্তে তিনি রাউজানের উরকিরচর ইউনিয়নে আসেন উরকিরচর এসে তিনি রশীদা নামক এক গরীব বিধবা নারীকে বিয়ে করেন। এই মহান অলিয়ে কেরামের বেলায়তি ক্ষমতা ছিল উজ্জল নক্ষত্রের মতো। তিঁনি জীবদ্দশায় ঘটনাক্রমে অসংখ্য কারামত প্রদর্শন করেছেন।

তাঁর পবিত্র জীবনের ইবাদত বন্দেগী, রেয়াজত তথা শরীয়ত ও মারফতের সাধনার সীমা অবর্ণনীয় পরিধিতে বি¯তৃত। কুদরতের এলাহীর জ্যোতি যেখানে অসাধারণ দীপ্তিতে বিচ্চুরিত, ইসকে এলাহী সেখানে মহাসমুদ্রের মতো তরঙ্গায়িত। ১৩৪৫ সালে ১০ মাঘ এই মহান অলির ওফাত হয়। হযরত লাল মিয়া শাহ (রহ.) এর মাজার সংলগ্ন পাড়াটি লাল মিয়া শাহ পাড়া নামে পরিচিত। প্রতিবছর ৯ মাঘ মহাসমারোহে ব্যাপক উৎসাহ উদ্দিপনায় এই মহান অলির বার্ষিক ওরশ শরীফ অনুষ্ঠিত হয়। সাধন কূলের শিরোমনি আধ্যাত্মিক জগতের ইনসানে কামেল মহান খোদা প্রেমিক হযরত লাল মিয়া শাহ (রহ.) এর উছিলাতে সকল ভক্তবৃন্দের আশা ও ইচ্ছা আল্লাহ তায়ালা পূরণ করুক । আমিন।
লেখক ঃ প্রাবন্ধিক, সংগঠক।

লেখকঃ মোঃ মহিউদ্দীন ইমন
উরকিরচর, রাউজান।

মতামত দিন