,

শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে এগিয়ে যাচ্ছে দুই শতাব্দীর ঐতিহ্যবাহী রাউজান বিমলানন্দ বিহার



:-: সাধন চন্দ্র বড়ুয়া:-:

রাউজানের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সুপ্রাচীনকাল থেকে অত্যন্ত সমৃদ্ধ বৌদ্ধ সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় ভাবাদর্শে প্রতিষ্ঠিত রাউজান একটি আদর্শ এলাকা হিসেবে ও প্রতিভাত। প্রাকৃতিক সৌন্দয্যের অপূর্ব লীলানিকেতন গিরিমেঘলা চট্রলা, প্রকৃতির অফুরন্ত ঐশ্বয্যের রম্যভূমি এবং ধন-ধান্যেও বিলাসভূমি রাউজান।চট্রগ্রাম জেলার অন্তর্গত রাউজান থানার অন্তর্গত রাউজান গ্রাম অবস্থিত। পূর্ব দক্ষিণ প্রান্তে সতত প্রবাহনে রাউজান খাল বেষ্টিত শস্য-শ্যামলা একটি আদর্শ উন্নত এই রাউজান গ্রাম। এই গ্রামের ইতিহামে ও একটা ছোট ইতিহাস আছে। প্রায় সাড়ে পাচশত বছর পূর্বে বাংলার বৌদ্ধরা নিজেদের ধনমান,প্রভাব প্রতিপত্তি সব হারিয়ে চট্রগ্রামের প্রান্তভাগে বনে জঙ্গলে,পাহাড়ের গূহায় আশ্রয় নেয়। কিছু সংখ্যক বৌদ্ধ বর্তমান রাউজান এবং কাগতিয়ার সংযোগস্থলে বসবাস করতে লাগলেন। তখন কাগতিয়া খাল মহাদেব পুরের (বর্তমান মোহাম্মদপুর) এর উপর দিয়ে প্রবাহিত ছিল। রাউজান খাল কদলপুর দিয়া প্রবাহিত ছিল। তখন বৌদ্ধ ভিক্ষুদের‘‘রাউলী’’ বলা হত। কোন এক মহাপ্রাণ ‘‘রাউলী’’ রাউজান খাল খাটিয়ে কাগতিয়া খালের সাথে সংযোগ করে দিলেন। রাউলী ‘‘জান’’ দিয়েছেন বলে এই খালের নাম হয় রাউজান খাল। এই খালের নামানুসারে রাউজান গ্রামের নামকরণ করা হয়। পরে পুরা থানা রাউজান থানা নামে পরিচিত। এই কথা সত্য যে রাউজান খাল একসময় বড়ুয়া পাড়ার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ছিল। বর্তমানে রাউজার গ্রাম বলতে শুধু বড়ুয়া অধ্যুষিত এলাকাকেই বুঝায়। দুই শতাব্দীকাল পূর্বে খৃষ্টাব্দে গ্রামের কতিপয় সমাজ সংস্কারক, স্বনামধন্য ব্যক্তিত্ব,ধর্মপ্রান উপাসক গনের বদন্যতায় রাউজান গ্রামে বিমলানন্দ বিহার স্থাপিত হয়।

অত্র বিহারে সূচনালগ্ন থেকে বহু প্রাজ্ঞ-বিজ্ঞ সংঘ মনীষী এবং মহামান্য উপসংঘরাজ গনের অবস্থান লাভে এই পূন্য তীর্থ বিমলানন্দ বিহার এক অপরূপ বৌদ্ধ বিহার হিসাবে বর্তমানে অত্যন্ত সুপরিচিত লাভ করেন। ১৯৬৭ খৃষ্টাব্দে ঐতিহ্যবাহী বাগোয়ান ফরাচিং বিহার থেকে ভদন্ত ধর্মপ্রিয় ভিক্ষু ঐতিহ্যবাহী বিমলানন্দ বিহারে অধ্যক্ষ হিসাবে অভিষিক্ত হলেন।(১৯৬৭-১৯৯০) এই সুদীর্ঘকাল বিহারাধ্যক্ষ হয়ে অত্র বিহারে অনেক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। বিহারের দায়ক দায়িকা ও বিহার পরিচালক কমিটির অকুন্ঠ সমর্থনে ১৯৬৮ খৃষ্টাব্দে বিমলানন্দ বিহারের পূর্ব পাশ্বস্থ ময়দানে বারদিন ব্যাপী ভিক্ষু পরিবামবত উৎসব ও বৌদ্ধ সম্মেলন বর্নাঢ্য অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়েছিল।

১৯৭১ খৃষ্টাব্দে স্বাধীনতা সংগ্রামের সময়ে অত্র বিহারে বিহারাধ্যক্ষ মহোদয়ের নিরলস প্রচেষ্টায় হিন্দু শরনার্থীর আশ্রয়দান এবং ভারত থেকে আগত মুক্তিযোদ্ধাদের অপার সহযোগিতা প্রদান করা হয়। ১৯৭২ খৃষ্টাব্দে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার এক বছর পর আর্থ সামাজিক উন্নয়ন প্রেক্ষাপটে বিহারাধ্যক্ষ মহোদয়ের একান্ত প্রচেষ্টায় বিমলানন্দ শিক্ষা সংস্কৃতি সমাজ কল্যাণ সংঘ স্থাপিত হয়।প্রতি বছর চৈত্র সংক্রান্তি তিথিতে সমাজ কল্যাণ সংঘের উদ্যোগে স্মৃতি ট্রাষ্টাদের স্মরণে মহতি সংঘদান,স্মৃতিচারন ও জ্ঞাতি ভোজের আয়োজন সহ নববর্ষ বরণে মেধাবৃত্তি প্রদান,বিজয়ীদের মাঝে একশতের অধিক পুরষ্কার গ্রাম্য ক্রীড়ামেদ্দীরা লাভ করে থাকে। আলোচনা সভা ও মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্টানের আয়োজন করা হয়। ১৯৭৪ খৃষ্টাব্দে বিহারাধ্যক্ষ এর পরিচালনায় ধর্মীয় শিক্ষার মান উন্নয়নে বিমলানন্দ পালি কলেজ স্থাপিত হয়্। বর্তমানে উক্ত কলেজ থেকে প্রতি বছর আদ্য,মদ্য ও উপাধি পরীক্ষায় বৌদ্ধ ছাত্রছাত্রীরা অংশ গ্রহন করে থাকে।১৯৭৮ খৃষ্টাব্দে বিহারাধ্যক্ষ ধর্মপ্রিয় স্থবির মহাস্থবির পদ বরণ উপলক্ষে দুই দিন ব্যাপী বর্নাঢ্য অনুষ্টানের আয়োজন করা হয়। উক্ত অনুষ্টানে বাংলাদেশের শতাধিক কীর্তিমান ভিক্ষু সংঘের উপস্থিতিতে বিশাল জনতার সমাগম হয়েছিল। ১৯৭৯ খৃষ্টাব্দে অত্র বিহারের বিহারাধ্যক্ষ মহোদয়ের নিজ প্রচেষ্টায় এবং দায়ক দায়িকাদের অকুন্ঠ সমর্থনে একতলা বিশিষ্ট পাকা বুদ্ধ ঘর নির্মাণ করা হয়। পরবর্তীতে অত্র বিহারের বিশিষ্ট দায়ক ও উপাসক প্রয়াত মুনীন্দ্র লাল বড়ুয়া এম.এ.(অবসর প্রাপ্ত পুলিশ ইন্সপেক্টর) মহোদয়ের পিতা-মাতার স্মৃতির উদ্দেশ্যে পুকুরে উন্নতমানের স্নানঘাট ও অপরুপ পাকা গেইট নির্মাণ করে বিহারের সৌন্দর্য্য বৃদ্ধি করেন। তাছাড়া ধর্মপ্রিয় লাইব্রেরী ও মাটির ঘরের এক কক্ষ বিশিষ্ট পাকা রুম তিনি নির্মাণ করেন এবং উক্ত রুমে তিনি দীর্ঘদিন অবস্থান করে গেছেন। ১৯৯২ খৃষ্টাব্দে অত্র বিহারে বিহারাধ্যক্ষ পদে অভিষিক্ত হলেন ভদন্ত কচ্চায়ন ভিক্ষু। ১৯৯২-১৯৯৫ সুদীর্ঘ চার বছরে ভদন্ত কচ্চায়ন ভিক্ষুর প্রচেষ্টায় বিদর্শন ভাবনা শিবির কার্যক্রম শুরু, প্রভাতী ধর্মায়তন,বিমলানন্দ শিক্ষা সংস্কৃতি সমাজ কল্যাণ সংঘের অধীনে সুরছন্দ সংগীত বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা সহ অনেক স্মৃতিময় কর্মকান্ডে তিনি উল্লেখযোগ্য ভ’মিকা পালন করে গেছেন। সাথে সাথে সংঘরাজ ভিক্ষু মহামন্ডল ধর্মীয় শিক্ষা পরিষদের মহাসচিবের দায়িত্ব সগৌরবের সাথে পালন করে গেছেন। বর্তমানে দিল্লীতে অবস্থানরত ডঃ কচ্চায়ন ভিক্ষু ১৯৯৬ খৃষ্টাব্দে অত্র বিহারে বিহারাধ্যক্ষ পদে অভিষিক্ত হলেন ভদন্ত মৈত্রীপ্রিয় ভিক্ষু। (১৯৯৬-২০১৭) সুদীর্ঘ ২১বছর যাবৎ অত্র বিহার পরিচালনা পরিষদের সার্বিক সহযোগিতায় এবং দায়ক দায়িকাদের নীরব সমর্থনে ২০০৪ খৃষ্টাব্দে অত্র বিহারে ‘‘বোধিপাল ভাবনা ঘর’’নির্মাণ, ২০০৬ খৃষ্টাব্দে বিহারের উত্তর পশ্চিম সীমানায় পাকা দেওয়াল নির্মাণ, পন্ডিত ধর্মাধার লাইব্রেরী উদ্বোধন, ২০০৯ খৃষ্টাব্দে পুরাতন বৌদ্ধবিহার জীর্ণ শীর্ণ হওয়ায় নতুনভাবে বৌদ্ধ মন্দির নির্মাণ,২০১৩ খৃষ্টাব্দে অত্র বিহারে অষ্টবিংশতি বুদ্ধ উপসনালয় নির্মাণ, মৈত্রীপ্রিয় স্থবির থেকে মহাস্থবির বর্ন্যাঢ্য অনুষ্টানের মধ্যে দিয়ে বরন অনুষ্টান সহ বহু স্মৃতি প্রতিষ্টান গড়ে তিনি উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে গেছেন। অত্র বিহারে অবস্থানকালীন সময়ে তিনি সংঘরাজ ভিক্ষু মহামন্ডল ধর্মীয় শিক্ষা পরিষদের মহাসচিব এবং ভিক্ষু মহামন্ডল এর মহাসচিবের দায়িত্ব সগৌরবে পালন করে গেছেন।২০১৭ খৃষ্টাব্দে অত্র বিহারের বিহারাধ্যক্ষ হিসেবে অভিষিক্ত হলেন স্মৃতিধর। উপসংঘরাজ ভদন্ত শীলানন্দ মহাস্থবির মহোদয়। অত্র বিহারের পরিচালনা পরিষদের পরিচালনায় বিহারাধ্যক্ষর নির্দেশনায় মাটির ঘর অযোগ্য হওয়ায় নতুনভাবে মেরামত করে প্রায় চার লক্ষ সাত্রিশ হাজার টাকা ব্যয় করে বিহারের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেন। অত্র বিহারে প্রতিদিন সন্ধ্যায় সমবেত প্রার্থনা সহ সূত্র পাঠ, এবং বৌদ্ধ ছাত্র ছাত্রীদের নৈতিক চরিত্র গঠনে শুক্রবার প্রভাতী ধর্মশিক্ষার আয়োজন দুইজন শিক্ষকের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়ে থাকে। অত্র বিহারের বিহার পরিচালনা কমিটির পরিচালনায় বিহারের লাইটিং ব্যবস্থা, মাইক সেটের ব্যবস্থা,দুইভাবে ত্রিপিটক বাংলায় অনুদিত সেট, বিদর্শন ভাবনা কার্যক্রম চালু, ইত্যাদি সহ বহু কার্যক্রম পরিচালনা পরিষদের পরিকল্পনাধীন। তাছাড়া জিলা পরিষদ বাস্তবায়নে ভিক্ষু সীমাঘরের পূর্ব পার্শ্বে মন্দির বিশিষ্ট লাভী শ্রেষ্ট সীবলী মহাস্থবির এবং খার বিজয়ী অরহত উপগুপ্ত মহাস্থবিরের মন্দিরের কাজ প্রায় সমাপ্তির পথে। আগামীতে ভিক্ষু সীমাঘর নির্মাণ বা উন্নয়নের কাজ কমিটি কতৃক করা হবে বলে আশা করা যায়।
১৯৫৫-২০১৮ সুদীর্ঘ ৬৩ বৎসরে অত্র বিহাওে অবস্থান কালীন মহামান্য উপসংঘরাজগনের তালিকা প্রকাশ করা হল। যথাক্রমে ডঃ জ্ঞানশ্রী মহাস্থবির, ডঃ শীলানন্দ মহাস্থবির, প্রয়াতপন্ডিত সুগত বংশ মহাস্থবির, প্রয়াত সাংঘিক ব্যক্তিত্ব, অরিন্দম মহাস্থবির, শাসনস্তম্ভ,বিচিত্র ধর্মকতিক,ধর্মপ্রিয় মহাস্থবির মহোদয়। তাদের পদচারনায় অত্র বিহার জাতীয় কেন্দ্রীয় বিহার হিসাবে পরিনত হয়েছে। অতীব সৌভাগ্যের বিষয়,০৯ নভেম্বর ২০১৮ শুক্রবার রাউজাওে বিমলানন্দ বিহার প্রাঙ্গনে বর্নাঢ্য অনুষ্টানের মধ্য দিয়ে দানোত্তম কঠিন চীবর দান মহতী ধর্মসভা ও সংবর্ধনা অনুষ্টানের আয়োজন করা হয়। উক্ত অনুষ্টানে বিহারের বিহারাধ্যক্ষ উপসংঘরাজ ভদন্ত শীলানন্দ মহাস্থবির মহোদয় অতি সম্প্রতি থাইল্যান্ড থেকে ‘‘ডক্টরেট ডিগ্রী’’লাভ করায় সম্মাননা প্রদান, সংঘরাজ ভিক্ষুর মহাসভার দায়িত্ব প্রাপ্ত সভাপতি শিক্ষাবিদ,বুদ্ধরক্ষিত মহাস্তবির মহোদয়কে সম্মাননা প্রদান,রাউজানের কৃতি পূন্য পুরুষ কলিকাতায় অবস্থানরত ডঃ জিনপ্রিয় মহাস্থবির মহোদয়কে সম্মানন্া প্রদান, রাউজানের কৃতি সন্তান ডঃ প্রবাল বড়–য়াকে সম্মাননা প্রদান অনুষ্টান, বিমলানন্দ বিহার পরিষদ ও দায়ক দায়িকাগনের পক্ষ থেকে যাবতীয় কার্যাদি সম্পন্ন করার দায়িত্ব ভার নেওয়া হয়। এবং বিমলানন্দ সম্মাননা স্মারক একটি ম্যাগাজিন প্রকাশিত হয়। আজ আমাদের ঐতিহাসিক আনন্দের দিন। অনুষ্টানমালা সফল করার লক্ষ্যে বিহার পরিচালনা পরিষদ ও দায়ক দায়িকাগনের আর্থিক,কায়িক,বাচনিক সার্থক ও সফলতা কামনা করছি।
​​​​​​‘‘জগতের সকল প্রাণী সুখী হউক’’
লেখক: সাধন চন্দ্র বড়ুয়া
সহকারী সিনিয়র শিক্ষক (অবঃ)
রাউজান আর্যমৈত্রীয় ইনিষ্টিটিউট
রাউজান,চট্রগ্রাম

মতামত দিন